বিউপি

 ১) বিউপি তে চ্যান্সেলর স্কলারশিপ পায় প্রতি ফ্যাকাল্টি থেকে হাতে গোনা দুই তিনজন। 

২) এইচ এস সি স্কলারশিপ পেয়েছে এমন শিক্ষার্থী খুঁজলে প্রতি ক্লাসে একজন দুজন পাওয়া যায়। (তবে স্পেশালি মনে রাখবেন: সেইটা সে কলেজে ভালো পড়ালেখার জন্য পায়। বিইউপিতে এসে দুর্দান্ত পড়ালেখার জন্য পায় না।) 

৩) ৮সেমিস্টারে যে স্কলারশিপ পাওয়া যায় তা মূলত ক্লাসের প্রথমসারির শিক্ষার্থীরা পেয়ে থাকে। অথবা গরীবের অভিনয় করা কিছু শিক্ষার্থীকে নিতে দেখেছি।(অভিজ্ঞতা থেকে বলছি) 

৪) টিচিং এসিস্ট্যান্ট এর টাকা পায় প্রতি ডিপার্টমেন্টের একজন।(আমাদের পুরো ডিপার্টমেন্ট থেকে এক ভাই পেয়েছিল) 

৫) রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট এর টাকাও পায় প্রতি ডিপার্টমেন্টের কয়েকজন। {তবে গ্র্যাজুয়েশন শেষে অবশ্যই। এবং এইগুলো অবশ্যই চাকুরী/ইন্টার্ন হিসেবে গণ্য হবে, ইহা বিইউপি হইতে প্রদানকৃত কোন শিক্ষাবৃত্তি/(ইংরেজিতে)স্কলারশিপ নহে। যেমন: ঢাকা ইউনিভর্সিটির কিছু কিছু ডিপার্টমেন্টে রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট নিয়োগ দেয়া হয় বাইরের ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীকে(এক ভাইকে চিনি); তারমানে তো এই না যে, DU সেই ভাইয়ের পড়ার খরচ প্রদান করলো বা স্কলারশিপ/বৃত্তি দিল।} 

এখন এসবের পরেও এইযে টাকার বিবরণগুলো দেয়া হয়েছে তার সর্বমোট ভাগীদার হলো বিউপির ১০০শতাংশ শিক্ষার্থীর ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী। যদি কেউ উপরোক্ত স্কলারশিপ গুলো পেয়েও যায় তবে সে হবেন ভাগ্যবান বা ভাগ্যবতী ৫%-৯% এর মধ্যে। মানে প্রতি ক্লাসে ৩-৬ জন। গুঢ় বাস্তবতার যাঁতাকলে পড়ে বাকি ৯০ শতাংশের কি হয় জানেন? আসেন গল্পগুলো শুনি।

এমন অনেক শিক্ষার্থীকে আমি চিনতাম যারা এই সেমিস্টার ফির টাকা বাইরে থেকে লোন করে পরিশোধ করেছে। কিছু বন্ধুকে চিনতাম যারা সেমিস্টার ফি/ ঢাকায় বসবাস এর জন্য রাত ৯টা পর্যন্ত টিউশন করত। এক বড় ভাইকে দেখেছি, জুনিয়রকে ভালোবাসত; জুনিয়রকে খাওয়ানোর মত উদার মন তার ছিল, কিন্তু পকেটে টাকা ছিলনা; মুখ লুকিয়ে চলত। বাবার কাছে ৬মাস পর পর ১৬হাজার টাকা নেয়া এবং প্রতি মাসে ঘিঞ্জি বাসায় থাকার ৫হাজার টাকা নেয়াটা তার কাছে সীমাহীন সংকট মনে হত। অন্য ডিপার্টমেন্টের এক বান্ধবীকে চিনতাম, যে টাকার কারণে ১২নাম্বার থেকে হেঁটে যেত(তখন লেগুনা ছিলনা)। এক ছোটবোনকে চিনতাম, যে সেমিস্টার ফির টাকা পরিশোধ করার জন্য কিছু পার্টটাইম জবও করত। যাতে সে ৮হাজার টাকা জমাতে পারে আর বাকি ৮হাজার টাকা সে বাবার কাছে থেকে নিবে। এক সিনিয়র আপুকে চিনতাম, যিনি সেমিস্টার ফি পরিশোধ করার তাগিদে মিরপুর ডিওএইচএসে টিউশন করাতো। সম্প্রতি এমন এক ছোটবোনকেও দেখেছি যে টিউশন এর জন্য ১২নাম্বার থেকে ডিওএইচএস যায়, প্রতিদিন; মাসপ্রতি ৩০০০টাকা কমানোর জন্য। এক ছোটভাইদের ক্লাসে, ওদের সবার কাছে থেকে চাঁদা তুলে ক্লাসমেটের সেমিষ্টার ফি দিতে হয়েছিল। আমি নিজেই টাকার জন্য সেমিস্টার ড্রপ দিতে চেয়েছিলাম। ২য় বর্ষে। অতঃপর সেই সময় আমার মেন্টর শিক্ষক ছিলেন জনাব আশিকুন্নবি নয়ন স্যার; যিনি তখন সাহস জুগিয়েছিলেন বিধায় ড্রপ দিতে হয়নি। Alhamdulillah। এমনকি আমি বর্তমানে একজন বিউপীর শিক্ষককেও চিনি, যিনি বিউপির ছাত্র ছিলেন এবং ছাত্রত্বকালীন সময়ে তার ক্লাসমেট/বন্ধুর বাবার কাছে টাকা ধার নিয়ে সেমিস্টার ফি পরিশোধ করেছেন। 

এইযে যতজনের কথা বললাম ইনারা শুধু একাংশ; এইরকম গল্প খুঁজলে আরো অনেক পাওয়া যাবে প্রতিটা ফ্যাকাল্টিতে/ প্রতিটা ডিপার্টমেন্টে/ প্রতিটা ক্লাসে। অতএব, একজনের একইসাথে ৮টা সেমিস্টার স্কলারশিপ পাওয়া, ২টা চ্যান্সেলর স্কলারশিপ পাওয়া, আর এইচএসসি বৃত্তির গল্পটা রয়ে যায় শুধু মাত্র ১০% শিক্ষার্থীর উপন্যাসে। বাকি শিক্ষার্থীদের উপন্যাসগুলো পড়বেন; তাদের জীবন-সিনেমার গল্পগুলো অনেক ব্যতিক্রম। ট্রুফো, ফেলিনি, ডি-সিকার বাস্তবধর্মী সিনেমার স্ক্রিপ্ট ঘটে যায় কয়েকশো ছাত্র-ছাত্রীর জীবনে। এই শিক্ষার্থীরা কখনোই “বাইসাইকেল থিফবস” দেখেনি; তারা জানেও না “ফোর হান্ড্রেড ব্লজ” এর কষ্টটা কোথায়? এরা বুঝেওনি “এইট এন্ড হাফ” এর কান্নাটা কেন হয়? অথচ প্রতিনিয়ত তাদের ভেতরে ঘটে যায় অজস্র মহাকাব্যিক সিনেমা। যার গল্পগুলো ভিত্তোরিও ডি সীকা জানতে পারলে হয়তবা আরো কয়েকটা জগৎবিখ্যাত সিনেমা বানিয়ে দেহত্যাগ করতেন; যার গল্পগুলো জানতে পারলে আন্দ্রে তারকোভসকি হয়তোবা মাত্র ৭টা সিনেমা করেই বিদায় নিতেন না; করতেন আরো ১৪খানা সিনেমা। 

.

(এবং শেষমেষ বি: দ্র: (বিশেষ দ্রষ্টব্য): টাকার কথা আগাম বলেই বিইউপী ভর্তি করান, ইহা সত্য; তা বলে অর্থসংকটে থাকা সেসব শিক্ষার্থীর জীবন-পরিক্রমার গল্পগুলোকে “গরীব” / “মন্দ-ভাগ্য” / “যোগ্যতাহীন” ভেবে অপমানিত করবেন না।)

[আর হ্যা, কিছু কিছু স্কলারশিপ/ শিক্ষাবৃত্তি  বাংলাদেশের সব পাবলিক ইউনিভার্সিটিই দেয়। “বাংলাদেশ সরকার দেয়”।

অনেক প্রাইভেট ভার্সিটিও স্কলারশিপ/ বৃত্তি প্রদান করে থাকেন। নর্থ সাউথ এ ভালো রেজাল্ট করলে waive/ মওকুফ হওয়ার সুযোগ আছে। ড্যাফোডিলের এক বন্ধুকে দেখেছি পুরো গ্র্যাজুয়েশন ফ্রী পড়তে। রেজাল্ট ভালো ছিল বিধায়। alhamdulillah]


No comments

Theme images by merrymoonmary. Powered by Blogger.