“গাভী বিত্তান্তের পরের বিত্তান্ত”: (পর্ব 2 / ফর্মা ১)
১ ফর্মা মানে ১৬ পৃষ্ঠা। প্রতি পৃষ্ঠায় ১৫০-৪০০ পর্যন্ত শব্দ থাকতে পারে। ১৬পৃষ্ঠা বা ১ফর্মা’য় ২৫০০ থেকে ৪৫০০ শব্দ থাকে। হুমায়ূন আহমেদের বেশ কিছু বইয়ের ১ফর্মায় ২১০০-৩০০০ শব্দ দেখা গিয়েছে। অন্যদিকে আহমদ ছফার বইগুলোতে ১ফর্মায় রয়েছে ৪০০০-৪৫০০ শব্দ। ব্যতিক্রমী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কিছু কিছু ফর্মায় তা ৪৫০০+ শব্দ পার করে গিয়েছে। যেমন: “চিলেকোঠার সেপাই” তে।
গত ২৯শে সেপ্টম্বর, আমি যেই লেখাটি লিখেছি/চেষ্টা করছি, ওই সংখ্যায় শব্দের পরিমাণ ছিল ২০০০+। নাম ছিল: “গাভী বিত্তান্তের পরের বিত্তান্ত”: (পর্ব ১/ ফর্মা ১)। আমার আজকের এই গল্পের শব্দ সংখ্যা ১০০০+। এই পর্বই হলো ১ম ফর্মার ২য় পর্ব। আমার ১ম ফর্মা লেখা শেষ হলো। যার শব্দসংখ্যা দাড়ালো ৩০০০+। আলহামদু লিল্লাহ। যারা আমার সেই লেখার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে (মেসেঞ্জার , কমেন্টবক্স ,ফোনকল ও দেখা করে) ভ্রুয়সি আলোচনা/সমালোচনা করেছেন; আমাকে সাহায্য করেছেন উপদেশ দিয়ে; লেখার গঠন বিবেচনায় শক্ত হতে বাধ্য করেছেন, তাদের সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। এই পর্ব দিয়েই ফর্মা ১ এর লেখা শেষ হলো।
এই পর্বের নাম
(পর্ব:২) “ফাঁকা ফাঁকা আসনে, গো রাজা সিংহাসনে”
ড. খন্দকার মুশতাকের কাছে মদনডাঙ্গা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী প্রজনন বিভাগের এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তির ঘটনাটা খুবই আশ্চর্যজনক মনে হলো। খন্দকার মুশতাক নিজেও বিশ্বাস করতে পারছেননা যে তিনি দেশের এমন গণ্যমান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরী পেতে পারেন। মুশতাক সাহেব দেশের প্রথম হতে চতুর্থ শ্রেণীর সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরীর উমেদারি করেও কোন কেলেশমতি করতে পারেননি বিধায় চূড়ান্ত হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। যদিও কিছুদিন আগেই সে নিয়ত করেছিলেন যে, দেশ ছেড়ে উড়াল দিবেন; পশ্চিমে ফেরত যাবেন, যেখানে সে তার পিএইচডি সম্পন্ন করেছিলেন সেখানেই ভাগ্য অন্বেষণ করবেন। তাই হঠাৎ এই চাকরির সুসংবাদ তাকে প্রচণ্ড শান্তি প্রদান করলো; যেন বুকের পাহাড় নেমে সাগরের জলে মিশে একাকার হয়ে গেল; যেন অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে নবজাতক শিশু মায়ের কোলে ঘুমানোর অধিকার ফিরে পেল। অন্যদিকে খন্দকার মুশতাকের বেগম মোছা: কুলসুন লুবনা, স্বামীর এই চাকরির সংবাদ শোনার পর আন্ডা পারা মুরগির মত চেচানো শুরু করেছেন। যাকে যেখানে যেভাবে পাচ্ছেন, সবাইকে স্বামীর এই আজিমুশ শান বয়ান করতে লাগলেন। অবশ্য খন্দকার মুশতাক সাহেবও এই আন্ডাপারা মুরগীর চিৎকারে কোনরূপ বাধা প্রদান করতে চাইলেন না। মুশতাক সাহেবের খায়েশ হচ্ছে, যেন খোদ নিজেও এই চিৎকার চেচামেচিতে সামিল হয়ে দোজাহানের সকল বদনসিব চেহারাগুলোকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিতে পারেন, তাহলে তার মনের ষোলকলা পূরণ হবে।
আমাদের দেশের বর্তমান সময়ের বেশিরভাগ শিক্ষক প্রতিশোধে বিশ্বাসী; হোক সেটা শিক্ষার্থীর সাথে, হোক তার নিজের শিক্ষকের সাথে, হোক তার সহকর্মীর সাথে, হোক অফিস সহকারীর সাথে, হোক ঠাটারী বাজারের কসাই এর সাথে।এদেশের ভাসা ভাসা জ্ঞান থাকা কতিপয় শিক্ষকেরা এমন এক ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে বসবাস করে থাকেন যে প্রতিশোধ নিতে পারলেই নিজের আত্মতুষ্টি হাসিল হতে পারে এবং নিজের সুমহান মর্যাদা নিশ্চিত করা যায়। ইনারা নিজের অধীনস্থ সবার প্রতিই একরকম অবজ্ঞা করেন। নিজেকে বড় করতে যেয়ে অন্য একশজনকে ছোট করতে প্রস্তুত থাকেন। উপরে উপরে ভালোবাসার রবীশংকর শুনালেও ভেতরে ভেতরে ঘৃণার ঐকতান ছুড়ে দেন।
কিছুদিন আগেই প্রাণী প্রজনন ডিপার্টমেন্টে যেয়ে নিয়োগপত্রটা গ্রহণ করতে হয়েছে। আজকে প্রথম অফিস। বেগমকে নিয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই বলে মুশতাক সাহেবের বুকে আফসোসের জলরাশি জমা পড়ল। বিদেশ বিভুঁইয়ে দীর্ঘ অনেকদিন প্রেম করে মুশতাক সাহেব বিয়ের পিড়িতে বসেন। তারপর দেশে ফিরে মদনডাঙ্গা কৃষি বিশ্বিদ্যালয়ের সহায়ক শিক্ষক হিসেবে খণ্ডকালীন শিক্ষকতায় নিযুক্ত হন।
একদিন তার বেগমসাহেবাকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন ক্যাম্পাসে। ইচ্ছা ছিল বেগমের হাত ধরে ঘুরে বেড়াবেন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে এই ঘটনার যে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে তা খন্দকার সাহেব থোরাই গ্রাহ্য করেন। তিনি মনের বাসনা পূর্ণ করেছেন। হাত ধরে হেঁটেছেন; সাক্ষী হয়েছে ক্যাম্পাসের দালানকোঠাগুলো। আজও তার মন চাচ্ছিল আদরের অর্ধাঙ্গীকে নিয়ে যাবেন। তবে তার সুযোগ নেই বলে কিছুটা গোমড়া মুখেই সকাল ৮টায় উপস্থিত হলেন প্রাণী প্রজনন বিভাগে।এসেই আফসোস এর পরিমাণ তীব্র থেকে তীব্রতর হলো। বেগম সাহেবকে আনতে পারেনি বলে মুশতাক সাহেবের আফসোস যতটা না হচ্ছিল, তার চেয়ে বেশি আফসোস যে ডিপার্টমেন্টে দুইজন পিএইচডি ধারী রয়েছেন। আরেকজন জহির হাসান সাহেব। এক বনে দুই রাজার বসবাস অসম্ভব। জহির সাহেবের চিকন-চাকন দোহারা গড়ন, ফর্সা চামড়া, কাচা পাকা চুল, মাথায় টাক। জহির সাহেব প্রত্যেকটি কথা বলা শেষে জিহ্বা দিয়ে মোটা ঠোঁট বেধে রাখেন। তবে মানুষ ভালো। রসবোধ রয়েছে। কিছুটা অন্যমনস্ক কিসিমের। উপরন্তু জহির সাহেবের সাথে অফিস ভাগাভাগি করতে হবে বলে তার প্রতি এক রাশ অবজ্ঞা জপে নিলেন মুশতাক সাহেব: “শালা একপাল গবেট ডিগ্রিধারীদের মধ্যে পড়ে গেলাম”। যাহোক, তিনি ইহাকে ভাগ্যের ফের বলে চালিয়ে নিলেন।
সহায়ক শিক্ষক হিসেবে বারবার ডিপার্টমেন্টে আসার বদৌলতে পরিচয় পর্ব তাদের আগেরই ছিল। খন্দকার মুশতাক সাহেব আপিসে যেয়ে চেয়ারে আরাম করে বসলেন। দীর্ঘশ্বাস গ্রহণ করলেন। চর্বিজমা পেটটা একটু ছেড়ে দিলেন। নিজেকে হুমায়ূনপুত্র আকবর ভেবে এক বালতি গাম্ভীর্য তৈরি করলেন মুখে। পাশের টেবিলে বসা ওই টাক পড়া লোকটাকে নিজের পুত্র জাহাঙ্গীর ভাবতেও ভালো লাগছে। মনে হচ্ছিলো, রাজ সিংহাসন আজ তার দখলে। হুকুম দেওয়া মাত্রই হাজির হবে অত্র জাহানের সকল খাবার দাবার, সকল গোপন কথা, অন্য রাজ্যের তথ্য, সকল রাজ্যের ব্যারাম, এই রাজ্যের কাগজপত্র-নথি। শিক্ষার্থীরা হলো তার প্রজা। এখানেই প্রজাদের তওয়াজ্জহ দিবেন খোদ বাদশাহ আকবর। অতিসত্বর এক নতুন তবলীগের আয়োজন করবেন। ধর্মপ্রচার শুরু হবে। তনজিম গঠন হবে। গরু বিষয়ক এস্তেহাদ জারি করতে হবে। গবেষনা হবে রাজকোষের টাকা দিয়ে। গবেষণায় মিলবে টাকা। আকবর সালতানাতের সূর্য তামাম দুনিয়ার এসপার ওসপার বিকরণ দিবে। দ্বিগবিজয়ী হবেন বাদশাহ। এখানে প্রজাদের হাল হালত পুছার জন্য রয়েছে কিছু পাইক পেয়াদা। তবে এখানের পাইক পেয়াদারা অতটা তৎপর না। একটা নায়েব দরকার। একটা গুপ্তচর প্রয়োজন।
দরজা খোলার আওয়াজে বাদশাহ আকবরের মুরাকাবা আঘাতপ্রাপ্ত হলো। পর্দানশীন এক মেয়ে আপিসে ঢুকলো; পুত্র জাহাঙ্গীরের সাথে কথা বলার জন্য। খন্দকার মুশতাক ভ্রু কুচকে তাকালো সেই মেয়ের দিকে। মন চাচ্ছিল এখনি রাজ জল্লাদ ডেকে এই মেয়ের কতল করে ফেলতে পারলে ভালোই হত। আকবরের ধ্যানে আঘাত হানার জুররত করেছে এই বদতমিজ জাহেল। ঢোক গিলে গোসা হজম করলো রাজা মুশতাক উরফে আকবর। মনে মনে জিজ্ঞাসা করলো ,
“কি চায় এই মেয়ে? আর এই মেয়ে আমার পূত্র জাহাঙ্গীরের কাছে কেন এসেছে? বাদশাহ আকবরের কাছে আসেনি কেন?”
জহির স্যারের প্রতি ঈর্ষার বাতাস মুশতাক সাহেবের মনে দোলা দিয়ে গেল। সব ভুলে, বাতাসের দোলাচল দূরে ঠেলে, সামনে আবিষ্ট ল্যাপটপ যন্ত্রে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মনোনিবেশ করলেন তিনি।
ল্যাপটপের ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে ১০টা বেজে গিয়েছে। কান দিয়ে শুনছিল সেই বদতমিজ মেয়ে আর জহির স্যারের কথা। মেয়েটা এসেছে ক্লাসের পড়া আবার বুঝতে। এসেই জহির স্যারকে বলতে শুরু করলো,
“স্যার আপনি ঠিক বলেছেন প্রজনন প্রযুক্তির পরিবর্তন আনা সম্ভব যদি আমরা সঠিকভাবে গবেষণা করতে পারি...”
খন্দকার মোশতাক সাহেব মনে মনে প্রতুত্তর করেন,
“এ আবার নতুন কি! গবেষনা করলেই তো পরিবর্তন আসবে, এই ছাইপাশ বলতে আকবরের পুত্র জাহাঙ্গীরের কাছে আসার কি প্রয়োজন! হুহ”।
জহির সাহেব নম্র, ভদ্র মানুষ। কিছুটা আত্মভোলাও বটে। ঠাণ্ডা স্বরে উত্তর দেয়,
“অবশ্যই”।
এরপর বদতেমিজ জাহেল মেয়েটি আবার বকবক করা শুরু করে। মেয়েটি প্রচুর ঘন কথা বলে। তার বেশি কথা বলার ব্যাপারটা পিথাগোরাসের উপপাদ্যের মত প্রমানিত, সিদ্ধহস্ত। অন্যকে বলার সুযোগ দিচ্ছেনা। মেয়েটি এক নিঃশ্বাসে ডজনখানেক লাইন বলে ফেলল। বেশিরভাগই “যেই লাউ সেই কদু” টাইপ কথাবার্তা। মাঝে মাঝে একটু আধটু আবেগ ও বেশিরভাগই জহির স্যারের সুনাম জড়ানো কথা ছিল। জহির স্যার মৃদু স্বরে বললো,
“জি, ইন শা আল্লাহ আমরা করবো”।
এই নির্জীব জহির লোকটার মধ্যে সুনাম গ্রহণের বিন্দুমাত্র প্রতিভা নেই। তার এই গোবেচারা স্বভাব দেখে খন্দকার মুশতাক বারংবার বিরক্ত হচ্ছেন। এই খবিশটা আকবর বাদশাহর পুত্র হিসেবে কলংক। অতঃপর জহির স্যার নিজেই এই বাকচরিতার ইতি টেনে দিল। মেয়েটিকে বলল,
"আমি বাইরে যাব। আপনি আসুন”।
মেয়েটির ব্যবহার একদম পাইক পেয়াদাদের মত। হুজুর হুজুর করে। কদম - বুসী, দস্ত-বুসি করতে জানে। মাথা নিচু করে, সেলাম ঠুকে ঘর থেকে বিদায় নিতে জানে। বাহ! এমন এক পেয়াদাসম প্রজাই তো মুশতাক সাহেবের প্রয়োজন। সে অতীব নওয়াব চিজ হতে পারে। মুশতাক উরফে আকবর যে গো-খামার দিবেন সেই খামারের গোয়ালিনি হতে পারবে এই পেয়াদা। ইহাকে চাই। যখন সেই মেয়েটি দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল আর হুজুর হুজুর করে সেলাম ঠুকছিল দুজনের দিকে, খন্দকার মুশতাক তখন মনে মনে বলছিল,
"যাও হে পেয়াদা, নসিয়ত করলাম, এরপরে তুমি আমার দিদার নিতে এসো। বর্তমানে তুমি যার মুখাতিব হয়েছো সে তোমার কদর বুঝবে না। তোমার আলফাজ ব্যয় করেছো আকবরপুত্র জাহাঙ্গীরের সাথে মোলাকাত করে। তোমার কলবের শান্তি দিতে পারবে শুধুমাত্র আমি বাদশাহ মুশতাক উরফে আকবর।”
To be continued..... পরবর্তী অধ্যায়:
1. খীরিনি রায়ের বিদেশ ভ্রমণ (শুক্রবার, ১০ নভেম্বর ২০২৩) রাত ৯টা
2. মুশতাক স্যারের অর্ধাঙ্গী: গাভীন গরু (শুক্রবার, নভেম্বর ২০২৩)রাত ৯টা
3. দীপাবলির আলোছড়ি (শুক্রবার, ডিসেম্বর ২০২৩) রাত ৯টা
4. পাগলা শাহীন, সামলা শাহীন (শুক্রবার, ডিসেম্বর ২০২৩) রাত ৯টা
5. শেয়ালবাবা তুনায়েদ খান (জানুয়ারি, ২০২৪) রাত ৯টা
6. একতাই বল, মুতার কূটকৌশল (ফেব্রুয়ারি ২০২৪)
7. হোসাদ্দেম গোসাদ্দেম (এপ্রিল ২০২৪)
8. চামচামির চমচম (জুন ২০২৪)
9. প্রথম ক্লাস, গণেশ বাবার প্রথম ক্লাস।
.
(লেখার মান ও গঠন বিবেচনার খাতিরে অধ্যায়গুলোতে পরিবর্তন আসতে পারে। )

No comments