Kabir Suman
"তারপরে পৃথিবীতে আঁধারের ধূপছায়া নামবেই,
মৌমাছি ফিরে গেলে জানি তার গুঞ্জনও থামবেই।
সে আঁধার নামুক না, গুঞ্জন থামুক না,
কানে তবু রবে তার রেশ তো।"
(Song Name : Surjo Dobar Pala Ase Jodi
Artist : Hemanta Mukherjee
Lyricist : Gauriprasanna Mazumder
Music Director : Nachiketa Ghosh)
সুমন "তোমাকে চাই" গানটার সাথে প্রায়ই এই গানটা গাইত। বাংলাদেশে সুমনের গানের সফর শেষ। তার গানের গুঞ্জন হয়তবা থেমে যাবে সেই সাথে তার গানের রেশটা অনেকদিন থেকেও যাবে।
টিকিটটা কেটে যেদিন বাসায় ফিরলাম,এক বন্ধু টিকিটটা হাতে নিয়ে দেখে আমাকে বলেছিল,"ফারুক, it's an achievement"। আমি অনেক্ষণ ওর কথাটা ভাবতেছিলাম। কী বললো ও! আজ সবশেষে নিজেরও বলতে মন চাচ্ছে হ্যা,its an achievement। বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা থেকে উঠে আসা ছেলের চোখে এমন এক মানুষকে স্বচক্ষে দেখা,যার গান শুনে বড় হয়েছি,আমার বয়স বেড়েছে যার গান শুনে- তাকে চোখে দেখা আমার কাছে এচিভমেন্ট এর চেয়ে কম কিছুনা। আমি স্বাধীন হতে শিখেছি যাদের গান শুনে,যাদের গান শুনে আজও অসাম্প্রদয়িক ভাবে বেচেঁ থাকতে শিখি,যার গান শুনে প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছি,ভালোবাসাকে অধিকারের আঙ্গিকে বলতে শিখিয়েছে যে লোকটা- তাকে সামনাসামনি দেখা,তার গান শোনাটা আমার কাছে অনেককিছুই। আমি আমার জীবদ্দশায় কোনদিন ভাবিনি আমি "সুমনের গান" শুনব। কখনই না, এক পলকের জন্যেও না।আমার জীবনকে প্রতিনিয়ত নাড়া দিয়ে যাচ্ছে যেই মানুষগুলো তাদেরকে যে চোখে দেখার,তার শো দেখার সৌভাগ্য হবে তা আমি স্বপ্নেও দেখিনি।
ভালোবাসায় বিশ্বাস করা,ভালোবাসার মানুষকে কতটা শক্ত অধিকারের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায় তা শিখিয়েছে সুমন। যেমন: "অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোন দাবী দাওয়া, এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকে চাওয়া",
"আমি তোমার পুরুষ আমি তোমার জন্মভূমি",
"যতবার তুমি জননী হয়েছ ততবার আমি পিতা"। প্রেমিকাকে উদার স্বরে ভালোবাসি বলতে শিখিয়েছে কে? সুমন।
"খোদার কসম জান,আমি ভালোবেসেছি তোমায়"
"বিক্ষোভে-বিপ্লবে তোমাকে চাই,
ভীষণ অসম্ভবে তোমাকে চাই"
"বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি শুধু তোমাকে চাই"।
.
স্বপ্নবাজ মানুষেরা প্রতিদিন স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। কিন্তু পিছুটান আর জীবনের যাঁতাকলে পড়ে স্বপ্নে স্থির থাকাটাও তো কষ্টের, ব্যথার এবং একসময় বিলাসিতার বস্তুও মনে হওয়া শুরু করে। জীবনের পথচলায় বারবার হোচট খেয়ে স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়ে যায় আমাদের। প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখতে আর বেচেঁ থাকার সাহস দেয় কার গান জানেন? 'সুমনের গান' গুলোই।
"স্বপ্নগুলো ছেড়েছো তো কয়েক বছর আগে,
আমার কিন্তু স্বপ্ন দেখতে আজও ভালো লাগে"
"দিনবদলের স্বপ্নটাকে হারিয়ে ফেলো না,
পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না"
"বন্ধু, তোমার ভালোবাসার স্বপ্নটাকে রেখো,
বেঁচে নেবার স্বপ্নটাকে জাপ্টে ধরে থেকো,
হাল ছেড়ো না,
হাল ছেড়ো না বন্ধু,
বরং কন্ঠ ছাড়ো জোরে,
দেখা হবে তোমায় আমায় অন্য গানের ভোরে"।
.
এমন এক রাষ্ট্রে বসবাস করি, যে রাষ্ট্রের ইতিহাসে রয়েছে ধর্মান্ধতার, মৌলবাদী চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশের, "আমি দেশ ভেঙে ভেঙে দুখান করেছি হিন্দু-মুসলমানে" সেই ভূখণ্ডেই আমাকে অসাম্প্রদায়িক হতে সাহায্য করে কে জানেন? সেই ভূখণ্ডেই হিন্দু, খ্রিস্টান, মুসলমান, বৌদ্ধ - সবাইকেই এক চোখে দেখতে সাহায্য করে কে জানেন? শত শত সাম্প্রদায়িক চিন্তাধারার মানুষগুলোর ভেতরে মুক্ত ভাবে ভাবতে শেখায় "আহা পাকস্থলিতে ইসলাম নেই নেইকো হিন্দুয়ানি,তাতে যাহা জল তাহা পানি।"
.
অনেকদিন আগে থেকেই আমার টেবিলে শুধুমাত্র একটা গানের লাইন কাগজে লিখে রেখেছি। আমি প্রায়ই লাইন গুলো দেখি। আমার কাছের মানুষদের কাছে আওড়াই লাইনগুলো। মানুষের জীবন-যাপনের অনেক উপাদানের মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হল মানুষের কষ্ট - মানুষের দুঃখ। এমন কোন মানুষ বেচেঁ নাই যার দুঃখ নাই, বিরহ নাই। সবাই, সব্বাই কোন না কোন বিপদে, কষ্টে ,ব্যাথায়, বেদনায় ভুগছে সর্বক্ষণ। কি করে উঠবে বুঝতে পারেনা মানুষ। কিন্তু, কিছু কথা-কিছু লেখা যদি আপনাকে বেচেঁ থাকতে যথেষ্ঠ শক্তি দান করে তাহলে তো মন্দ হয়না। টেবিলে লিখা সেই গানের লাইন গুলো হল:
"বলে সুখে আছো যারা সুখে থাকো এ-সুখ সইবে না, দুখে আছো যারা বেঁচে থাকো, এ-দুখ রইবে না।" সুমনেরই লিখা।
কবির সুমনের গানের সাথে আমার পরিচয় ২০১৪ সালে। শুভর সাহায্য নিয়ে। সেই বছর মুক্তি পেয়েছিল সৃজিত মুখোপাধ্যায় এর জাতিস্মর সিনেমাটি। তখন আমি কুইন্স কলেজের হোস্টেলে থাকতাম। জাতিস্মর এলবামের গান গুলো শোনা থেকেই মূলত কবির সুমন কে চিনি। এর আগে না। আমি তখন এই লোক সম্পর্কে কিছুই জানতাম। এমনকি এটাও না যে, এই লোক কোন কালে সুমন চট্টোপাধ্যায় ছিলেন। অতঃপর ২০১৫ সালের শেষের দিকে আমি জাতিস্মর দেখি এবং এই সিনেমার গান গুলোতে এতটাই মুগ্ধ হয়ে যাই যে পরবর্তী সময়ে প্রচুর সময়,শ্রম আর পড়ালেখা দিয়ে লিখে ফেলি "জাতিস্মর" সিনেমার একটি রিভিউ। যা লিখার একমাত্র কারণ ছিল "কবির সুমন"। আমি ভাবতেই পারিনা তেমন একটা লেখা কিভাবে লিখেছিলাম! তাও আবার সেই লিমিটেশন এ বসবাস করে! ভালো ফোন ছিল না, ল্যাপটপ ছিল না, ছিল না ভালো নেটের সুবিধাও। কবির সুমন আমার ভাবনার জগতে জ্ঞান আহরণের ক্ষুধা দশ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। হ্যা, এইটা উনি করতে পারে। যে কারোর সাথেই করতে পারবে। আপনি একবার সুমনে মজে গেলে, পৃথিবীর তাবৎ সব জিনিস নিয়ে আপনার জ্ঞান আহরণের ক্ষুধা অসম্ভব বৃদ্ধি পাবে। সেইখান থেকে শুরু হয়েছিল কবির সুমনের জগতে ঘুরাঘুরি করা। যতটা না নিজে করেছি তার চেয়ে বেশি করতে পেরেছি শুভর প্ররোচনায়। দীর্ঘ অনেকদিন একসাথে আড্ডা, গান, গল্পের সময়- বিভিন্ন গল্পের প্রসঙ্গে-অপ্রসঙ্গে, আমাদের আলাপনের ভিতরে বারবার ঢুকে গিয়েছিল কবির সুমন। কিছু গানের লিরিক তো ওর সাথে গাইতে গাইতে মুখস্তই হয়েছিল। "সুমনের গান"শোনা শেষ। সে হয়তবা কলকাতাতে ফিরেও গিয়েছি। তার লেখা একটাই তো গান আছে যেটা এখনকার অবস্থায় সবচেয়ে মানানসই।
.
"সে চলে গেলেও,
থেকে যাবে তার
স্পর্শ আমারই হাতের ছোঁয়ায়।"


No comments