An unknown friend

 

 An unknown friend far from the city


আমরা তিন বন্ধু।
জামালপুর টাউন জংশন স্টেশন।
বিকেলের অগ্নিবীণা ট্রেনের টিকিট কেটে স্টেশনের পাশের এক ঝুপড়ি তে বসেছি এক কাপ দুধ চা খাব বলে।
আমার চা প্রায় শেষ হঠাৎ এক প্রতিবন্ধী ফেরিওয়ালা পাশে এসে বসল।
অকেজো দুই হাত।
এক কব্জিতে লাল বালতি।
অন্যটিতে নেটের ব্যাগ।
গায়ে লাল সাদা স্ট্রেপ করা হাফ হাতা কলারওয়ালা গেঞ্জি।
মুখের কালো মাস্কটি থুতনিতে নামিয়ে রাখা।

এসেই কথা বলা শুরু করল। আমার দুই বন্ধু এই যুবক বড় ভাইটির সাথে বাক্য বিনিময় করছিল বলে অন্যমনস্ক ভাবে আবছা আবছা আমিও শুনছিলাম। কথা প্রসঙ্গে এবং জিজ্ঞাসা করায় সে তার ফেরি করার সময়গুলো এবং কাজ করার রুটিনগুলো বলছিল।
প্রতিদিন দুপুরে বাসা থেকে বের হয়ে ট্রেনে ট্রেনে ফেরি করে।
বিক্রি শেষে রাত ১টায় বাসায় ফিরে।
ঘরে তার এক ছেলে এক মেয়ে।
ছেলেটা ৭বছরের। স্কুলে যায়।
আর ছোট্ট মেয়েটাতো এখনো ছোট্টই ।
প্রতিদিন তার ৫০০ টাকা কামাই হয়।
যেখানে কিছু টাকা গৃহপালিত গরুটির পেছনে ব্যয় হয়।
ছেলের পড়াশোনার পেছনে কিছু ব্যয় হয়।
সংসারের ভরণ পোষনেও খরচ হয়।
সামান্য আশাভরা বুক নিয়ে বলল,ছোট্ট মেয়েটার জামা ও কিনে দেয় মাঝে মাঝে।
আমি ততক্ষনে তার সকল কথায় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ফেলেছি। একবার মুখ ফুটে বললামও "বড় ছেলেটাকে পড়ালেখা করাবেন অবশ্যই, থেমে যাবেন না।"
সে উজ্জ্বল বেগ ধারণ করেই বলল "যতদিন সুস্থ আছি পড়াবো।"
আমি নিজেই নিজের শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত নিয়ে একবার ভাবলাম। ভাবতেছিলাম এই লোকটার হাত তো অকেজো! উনি তো পঙ্গু! কত কিছু নিজের করতে পারেনা! আহারে!
পরক্ষণেই নিজের ভেতরে প্রশ্ন আর বিস্ময় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল ।তবুও লোকটার এত তেজ!
এত উদ্যম!
এত আশা!
এত সাহস বুকে নিয়ে কিভাবে চলে!
ভয় হয়না!
মুখ ফুটে তাকে "সাহসী" বলতে আমার কিছুটা সংকোচই হচ্ছিল এবং অপ্রস্তুত ও লাগছিল । তবুও তার দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে বলেই ফেললাম,
"ভাই,আপনি অনেক সাহসী।"
আমার কথা শেষ না হওয়ার আগেই অন্যদিকে তাকিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল,
"সাহস রাখতেই হবে, দুর্বল হলে চলব না। সাহস আরো বাইড়া গ্যাছে বিয়ার পর।"
তিন বন্ধু এবার যেন আরো নিস্পলক দৃষ্টিতে, গভীর মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকালাম। তিনজনের মনেই যেন অজান্তে একই প্রশ্ন জেগে উঠলো,
"কেন?"
সে তার কথায় বিরতি না দিয়েই বলে চলল,
"হাত পাততাম বলে শশুর বাড়ীর লোকজন আমার বউরে বলছিলো, দেখ তোর স্বামী কি করে! সেইদিন থেকে বউরে নিয়া আসছি শ্বশুরবাড়ির থেকে। আর কোনদিন এক মুহূর্তের জন্য কর্ম ছাড়া থাকিনি। হাত পাতিনি। অক্ষন নিজের কর্ম কইরা খাই।"
এসব কথাশোনার পরে ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল সবকিছু। আমাদের তিনজনের চোখে এক নায়কের রূপে মূর্তীয়মান হলো এই লোকটা।

অতঃপর উনি নিজ চায়ের বিল দেওয়ার জন্য উদ্ধত হলে আমরা তিনজনই তাকে অনুরোধ করি যাতে বিল টা আমাদেরকে দেওয়ার সুযোগ দেয়। তারপর সে হাসিমুখে রাজি হল।
পান খেয়ে চলে যাচ্ছিল এমন সময় জিজ্ঞাসা করলাম,
"ভাই আপনার নাম কি ?"
নম্রতার কণ্ঠে বলল,
"মকবুল।"
মকবুল ভাই এর অনুমতি নিয়ে তার সাথে আমরা একটা ছবিও নিয়ে রাখি স্মৃতি হিসেবে। তারপর বসন্তের বিকেলের সোনা রোদে হেটে হেটে মিলিয়ে যেতে থাকল মকবুল। আমাদের তিনজনকে শিখিয়ে দিয়ে গেল হাজার বছর বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা বুকে কিভাবে নিতে হয়।
.
তারপর ভাবছিলাম, বউয়ের জন্য , সংসারের জন্য যে লোকটা নিজের প্রতিবন্ধিতাকে ঢাল হিসেবে নিয়ে যুদ্ধ করছে তার বুক থেকেই তো এই গানটা মানায়,"অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোন দাবি দাওয়া, এই নশ্বর জীবনের মনে শুধু তোমাকেই চাওয়া।" আমরা তো শুধু ইট পাথরের দেয়ালে বন্ধি হয়ে, দামি হেডফোনে আমাদের কমদামি দুঃখবিলাস গুলো করি। অথচ সে কতটা শক্তিশালী, কতটা বৃহৎ । নশ্বর এই জীবনে অবিনশ্বর সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকে জয় করে নিয়েছে হাসিমুখে, উজ্জ্বল গালভরা সুখে। আর আমরা জীবনের সুখের আশায় গাড়ি বাড়ির স্বপ্ন দেখি। আফসোস করি। ইশ যদি একটা বাড়ি থাকত! ইশ যদি একটা ভালো গাড়ি থাকত! একবার ও ভেবে দেখিনা ইতোমধ্যেই সৃষ্টিকর্তা আমাকে কত কিছু দিয়ে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। আমার খাবার নিয়ে ভাবতে হয়না, আমার কাপড় নিয়ে ভাবতে হয়না , আমার চলার টাকা নিয়ে ভাবতে হয় না। আমি ভাবি সম্পদ নিয়ে, সম্পত্তি নিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে, চাকুরি নিয়ে। তবুও নাকি আমি হতাশ , আমি নারাজ উপরওয়ালার উপরে। আহা! কতটা অকৃতজ্ঞ আমি ! একবার তো সৃষ্টিকর্তা কে বলাই যায়, তুমি আমাকে অনেক দিয়েছ, তোমার প্রতি শুকরিয়া শেষ হবার নয় ।

No comments

Theme images by merrymoonmary. Powered by Blogger.