জাতিস্মর : আ মিউজিক্যাল অফ মেমোরিস। (2014)

 






একটি প্রত্নতত্ত্বীয় চলচিত্র।
-
-
-
-
-
জাতিস্মর :  আ মিউজিক্যাল অফ মেমোরিস। 
মুক্তি:  ১৭ জানুয়ারি ২০১৪
জনরা: বায়োগ্রাফি - মিউজিক্যাল ড্রামা - হিস্ট্রি 
ডিউরেশন : ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট
ভাষা: বাংলা
দেশ: ভারত 
কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ, পরিচালনা : সৃজিত মুখোপাধ্যায় ( বাইশে শ্রাবণ, অটোগ্রাফ,হেমলক সোসাইটি)
অভিনয়ে : প্রসেঞ্জিত চট্টোপাধ্যায় , যীশু সেনগুপ্ত, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়,  আবির চট্টোপাধ্যায় , সৃজিত মুখোপাধ্যায় , রিয়া সেন। 
সংগীত পরিচালনা: কবীর সুমন
আবহ সংগীত : ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত ( আয়নাবাজি) 
সিনেমাটোগ্রাফি : সৌমিক হালদার ( চাদের পাহাড়,জুলফিকার, ছোটদের ছবি)
.
___________________________
"জাতিস্মর" ৬১তম জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার এ সবচেয়ে বেশি বিভাগে পুরস্কার পায়। ৪ টিতে। 
সেরা সুরকার : কবির সুমন
সেরা গায়ক : রুপঙ্কর বাগচি
সেরা পোশাক পরিচালনা : শ্রাবর্নী দাস
সেরা রুপসজ্জা (মেকাপ) : বিক্রম গায়কোয়াড 
.
__________________________
.
রোহিত মেহতা (যীশু) গুজরাটের সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এবং কোলকাতায় বেড়ে উঠা এই ছেলেটি কলেজে পড়ুয়া এক বাঙালি মেয়ে মহামায়ার(স্বস্তিকা)  প্রেমে পড়ে যায়।  কিন্তু মহামায়া দারুনভাবে বাঙালি। তারমতে শুধু ইলিশ মাছ খেলেই, রবী ঠাকুর পড়লেই ,আর মান্না দে শুনলেই বাঙালি হওয়া যায় না। তাই মহামায়া যীশুকে, প্রেম তো দুরের কথা বন্ধুত্ব্বেই নাকচ করে দেয়। এবং বলে,  যদি শুদ্ধ বাংলা ভাষায় তারজন্য একটা গান লিখে শুনাতে পারে তাহলে সে যীশুর ব্যাপারে ভেবে দেখবে। এরপর যীশু চলে যায় বিলাতে কলোনিয়াল হিস্ট্রি বা ঔপনিবেশিক ইতিহাস ( আমার পড়ার খুব ইচ্ছা ♥, কিন্তু আমরা পড়তিছি জিওলজিক্যাল হিস্ট্রি,হুহ) পড়ার জন্য। ২ বছর কেটে যায়। সেখানে তাকে বাংলা শিখতে সাহায্য করে তার বন্ধু বোধি ( আবির)।  এবং সেখানে সে পর্তুগীজ মিউজিক এর ক্লাসও করতে থাকে।  কোর্সের গবেষণার কারণে তাকে একজন মিউজিসিয়ান এর জিবন বেছে নিতে হয় । যীশু নির্ধারণ করে,  উনবিংশ শতাব্দির লোকসংগীত-হেন্সম্যান অ্যান্টনি।  এরপর এই বিষয়ে বিশদ জ্ঞ্যান আহরণের জন্যই যীশু চলে আসে দেশে। ফরাশডাংগা, চন্দননগর। এখানে খোজ করতে করতে পরিচিত হয়ে যায় এক লাইব্রেরিয়ান এর সাথে, যিনি নাকি প্রতিনিয়ত অ্যান্টনিকে দেখেন, নাম কুশল হাজরা ( প্রসেঞ্জিত) । কুশল হাজরা রাত দশটার দিকে যীশুকে আমন্ত্রন জানায় তার বাসায় আসার জন্য এবং বলেন তিনি নাকি অ্যান্টনির সাথে দেখা করিয়ে দিবেন।  এর পরেই আগাতে থাকে জাতিস্মর এর কাহিনি। জানতে হলে আপনাকে দেখতে হবে। 
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
কে এই অ্যান্টনি??
^
পশ্চিম বাংলার চন্দননগর জেলার ফরাশডাংগায় ১৭৮৬ সালে ( যে বছর লর্ড কর্নওয়ালিস প্রথম আসে কোলকাতায়) সম্ভ্রান্ত পর্তুগীজ এক ব্যাবসায়ীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করে হেন্সম্যান অ্যান্টনি। বাংলা লোকসংগীত ও বাংলা কবিগানে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখে এই মহর্ষি ব্যক্তি। এবং ১৮৩৬ সালে পশ্চিম বাংলায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<
ডিরেকশন : সৃজিত মুখোপাধ্যায় এর  ডিরেকশন শুরুর দিক থেকেই ভালো ছিলো জাতিস্মরে। কিছু কিছু জায়গায় খাপছাড়া মনে হলেও একেবারে ভেস্তে যেতে দেন নি। শেষপর্যন্ত ভালোই ছিলো। কিন্তু কয়েকটা কবিগানের ব্যাপ্তি একটু বেশি মনে হয়েছে। আবার শেষের দিকেও আধুনিক বাংলা ব্যান্ড সংগীত এর কান ঝালাপালা করা সেই গানগুলো ব্যাবহার করা আমার কাছে অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে। কিন্তু মোদ্দা কথা লোকটা খেটেছে অনেক। দারুন কিছু শট নিয়েছে। ক্লাসিকাল মিউজিকের সাথে আলতোভাবে ব্যাবহার করা কিছু লংশট সত্যিই অনেক মুগ্ধকর ছিলো। 
<><><><><><><><><><><>
.
গল্প, চিত্রনাট্য : এই দুটোই সৃজিতের।  গল্প আর চিত্রনাট্যে কোন প্রকার সমস্যা ছিলো না। তবে কিছু কিছু জায়গায় চরিত্রের বিশালতা দরকার ছিলো। যেমন খরাজ মুখোপাধ্যায় এর চরিত্রটা কিছুটা আগে থেকে টানলে ভালো হতো। অন্যদিকে, মহামায়ার সেই দুইবন্ধুর গল্পটা কম দেখালেও হত। সেদিক থেকে আবিরের চরিত্রটি, মানে বোধি, গল্পের প্রয়োজনে আসা একটি চরিত্র। দারুন লেগেছে।
.
<><<>><><<>><><<>><><<>>
.
সংগীত : এই একটি জায়গায় পুরো জাতিস্মর টিমকেই ১০/১০ দেয়া যেতে পারে। অসম্ভব ভালো মিউজিক করেছে কবির সুমন, সৃজিত, আর ইন্দ্রদীপ দাসগুপ্ত।  তারা প্রচুর পরিমানে ঘাটাঘাটি করে, সেই উনবিংশ শতাব্দির প্রাককালে ওপার বাংলার হিন্দু সমাজে কবি গানের প্রচলন কেমন ছিলো আর কি আঙ্গিকে গাওয়া হত সব কিছুই বের করেছিলো খুবই মোলায়েম ভাবে। এবং একজন ফিরিঙ্গি সেই গান গুলোকে গাইলে কোন আঙ্গিকে গাইতে পারে তারো বিবরণ রাখা হয়েছে মিউজিকে। সেই সময় কাওয়ালের কাজও লক্ষনীয় ছিলো বাংলায়। তার প্রমাণও রয়েছে জাতিস্মরে।
১৩ টি কবিগান, ৫ টি আধুনিক গান রয়েছে মুভিতে।
.
++++++++++++++++++
.
সিনেমাটোগ্রাফি, লোকেশন,ক্যামেরা, কস্টিউম সবার কাজই খুব ভালো ছিলো। নিখাত না হলেও বলতে হবে তারিফের দাবিদার বা যোগ্য।
.
+++++++++++++++++
.
_______________________________
এবার জেনে নেই মুভিটির কিছু জানা অজানা তথ্য :
১)জোহান ভন গোথের এক কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কবির সুমন ৯০ এর দশকে একটি গান লিখে জাতিস্মর নামে।  ১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে গান গাইতে যায় সুমন। তখন সৃজিত প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র। সেইখানে জাতিস্মর গান টা শুনে হঠাত মাথার মধ্যে এক গল্প হাতছানি দেয় আর তারই বিস্তৃত রুপ হল "জাতিস্মর" চলচিত্রটি।
.
.
২) সৃজিত মুখোপাধ্যায়, সত্যজিত রায়ের ভীষণ ভক্ত। প্রত্যেকটি সিনেমাতেই  সে সত্যজিতের জন্য কিছু না কিছু উপাদান রেখে দেয়। জাতিস্মর মুভিতে প্রসেঞ্জিত এর চরিত্রের নাম "কুশল"। সত্যজিত রায়ের বিখ্যাত মুভি "সোনার কেল্লা"। (আহা সোনার কেল্লা♥♥♥,  one of the best bengali creation, আনন্দে  আটখানা হয়ে নাচতে পারি এই মুভিটার জন্য)  "সোনার কেল্লা" মুভিতে মুকুল নামে জাতিস্মরের চরিত্রটি পালন কুশল নামক এক ছোট্ট ছেলে এবং জাতিস্মর মুভিতেও সেই আঙ্গিকে প্রসেঞ্জিত এর নাম দেয়া হয়েছে "কুশল"। সৃজিত নিজেও বলেছে, জাতিস্মর অথবা প্যারা সাইকোলজি এই টাইপের শব্দের সাথে প্রথম পরিচয় সেই মানিকবাবুর "সোনার কেল্লা" পড়তে গিয়ে।
.
.
৩) জাতিস্মর মুভিতে একটা জায়গায়, আমরা দেখি প্রসেঞ্জিতের সাথে কুষ্টিয়ার সাধক লালন সাইজির আগমন।  অদ্ভুত ব্যাপার হল যে,  প্রসেঞ্জিত লালনের বায়োগ্রাফি করে "মনের মানুষ", যার পরিচালক ছিলেন গৌতম ঘোষ( পদ্মা নদীর মাঝি, শঙ্খচিল)। জাতিস্মর মুভির লালনের ভুমিকায় অভিনয়ের জন্য গৌতম ঘোষকে অনুরোধ করেন সৃজিত এবং গৌতম ঘোষ রাজিও হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শুটিং এর কয়েকদিন আগে জরুরি কাজে বিদেশে চলে যাওয়ায় তা আর করা হয়ে উঠেনি।
.
.
৪) ১৮০০ সালের দিকে,  পশ্চিমবাংলার শোভাবাজার রাজবাড়িতে কবিগান হত অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি ও ভোলাময়রার। সৃজিত কাহিনির লোকেশন বাস্তব রাখার কারনেই বেছে নেন সেই রাজবাড়িটিকেই।  শোভাবাজার রাজবাড়িতে শুটিং করার সময় ঘটে যায় কিছু অপ্রিতিকর ঘটনা। সৃজিত মিডিয়াতে স্পস্টভাবে বলে যে, তার মনে হচ্ছিলো তারা সেই রাজবাড়িতে একা নেই। সৃজিত নাকি দেয়ালের এক পাশে নাগাদারে অনেকগুলো মশাল জালিয়ে রাখে। এবং হঠাত করে কোন বাতাস ছাড়াই সবগুলো মশাল হুট করে একসাথে নিভে যায়।  এসব ঘটনা সৃজিতের চোখে অন্যরকম লেগেছিলো তখন । আমি বিশ্বাস করিনা।
.
.
৫)সংগীত পরিচালনার জন্য one and only choose ছিলো কবির সুমন। কিন্তু সুমন কি আর হাতের মোয়া!!  চাইলেই তো আর আসে না। তাও আবার কোলকাতার মুভিতে। সৃজিত যখন প্রথম কবির সুমনের কাছে যায়, তখনি সুমন নাকচ করে দিয়েছিলো।  সৃজিত অনেক হাতে পায়ে ধরেছিলো , তবুও কবির সুমন রাজি হয়নি। অতঃপর সৃজিত বলে, "দেখো, আমি এই গল্পটা প্রসব করেছি তোমার গানের শুক্রানু থেকে,প্লিজ কাজটা করো " তারপরেও কবির সুমন করতে রাজি হয়না।  তিনি বুদ্ধি পাকে কিভাবে এই ছেলেকে তারাতারি বিদায় করা যায়। ২০১২ সালে বাংলায় মিউজিক ডিরেক্টর দের অনারিয়াম ছিলো ২-৩ লাখ টাকার মত। কবির সুমন  সৃজিতকে ভাগানোর জন্য বলে ফেলে, আমার ১০ লাখ টাকা চাই। এই কথা শুনার সাথে সাথেই সৃজিত হ্যা বলে দিয়েছিলো।
.
.
৬) ১৩ টি কবিগানই সৃজিতের বাছাই করা। 
====================
            ÷÷÷÷÷
====================
.
আমার দেখা একবিংশ শতাব্দির সেরা বাঙালি সিনেমা জাতিস্মর। আমার বুকের অনেক্ষানি জুড়ে রয়েছে এই সিনেমাটি।কলেজে পড়ার সময় যখন দেখেছিলাম তখনি খুব ভালো লেগেছিলো। ধীরে ধীরে ভালোলাগাটা সত্যিই ভালোবাসায় পরিণত হয়ে গিয়েছে। প্রতিনিয়ত গানগুলো শুনতে শুনতে এক প্রকার মুরিদ হয়ে গিয়েছি এই এলবামের। যারা এখনো দেখেননি তাদেরকে করোজোরে অনুরোধ করি, দেখে ফেলতে পারেন সৃজিত মুখোপাধ্যায় এবং কবির সুমন এর এই বিখ্যাত কাজটি। হতাশ হবেন না সিউর। প্রথমবারের দেখায় মুভিটির পুরোটুকু নেওয়া সম্ভব না, কারণ প্রথমবারের দেখায় আপনার ধারণায় পরিবর্তন আসবে। বারবার দেখার পর একসময় আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন এই মুভিটি শৈল্পিক ধারায় কতটা সফল।
♥♥♥♥♥♥♥♥♥
প্রত্নতত্ত্বীয় চলচিত্র বলার কারন হল,  এই মুভিতে এমন কিছু তথ্য পাবেন যা আপনি কোন বই ঘেটে বা উত্তম কুমারের অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির বায়োগ্রাফি দেখে অথবা মান্না দের গান শুনেও খোজ পাবেন না। অ্যান্টনির হারিয়ে যাওয়া অনেক বিবরণকে অকপটে তুলে ধরা হয়েছে এই মুভিতে। যা আপনি কোত্থাও পাবেন না। তাই দিনশেষে এটি একটি Archaeological Must Watch Masterpiece.

No comments

Theme images by merrymoonmary. Powered by Blogger.