লাল নীল দীপাবলি' ও আমার নজরে নজরুল।

 



সাম্প্রতিককালে হুমায়ূন আজাদ এর "লাল নীল দীপাবলি:বাংলা সাহিত্যের জীবনী" পড়ে উঠেছি। এত গোছালো, পরিমার্জিত, স্পেসিফাইড লেখা! মনে হচ্ছিল যেন বাংলা সাহিত্যের গভীর সাগরে ডুবে ডুবে অতল গহ্বরে ঢুকে যাচ্ছিলাম। চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, মনসামঙ্গল নিয়ে শুরু হয়ে বৈষ্ণব পদাবলী, বিদ্যাপতি,চণ্ডীদাস,কীর্তিবাস আর কাশিরাম। আহা! একেকটি যেন আগুনের বৃহৎ গোলা। সগীর, আলাওল, হাকিম নিয়েও অসাধারণ লিখেছেন হুমায়ুন আজাদ। অতঃপর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু। কেউই বাদ যায়নি। তাবৎ বাংলার যত কবি সাহিত্যিক রয়েছেন সবার সম্পর্কেই তিনি যথেষ্ট সম্মান-মর্যাদা রেখে সঠিক তথ্যটি তুলে ধরেছেন। যেমন: মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর- ইনাদের জীবনগাঁথা আমাকে চলার পথে অনেক বেশি অনুপ্রেরণা যোগায়। আমি অনেক আশাহত হতাম যদি তাদের সম্পর্কে সঠিক বিচারভঙ্গিটা প্রকাশ না পেত। কিন্তু এমনটি হয়নি। হুমায়ুন আজাদ তার জীবনের সংগ্রহ করা, আহরণ করা একবুক ভালোবাসা ও মায়ার আঁচড় দিয়ে সাজিয়ে তুলেছে "লাল নীল দীপাবলি" নামক নারীটিকে। (এমন ইতিহাসনির্ভর সাহিত্যের বই আর কয়টা আছে জানিনা, জানলে জানাবেন দয়া করে। মাহবুবুল হক স্যারের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বইটি এখনো পড়িনি। তবে পড়ব।)
এবার আসি কষ্টের কথায়। "খুবই ভালো মানের বই" -শেষ পর্যন্ত এই বাক্যটি বলতে গেলে একটু হিচকি চলেই আসে আমার। বাংলা সাহিত্যে জগতের এমন কেউ নেই যার কথা অপারভাবে লিখেন নি হুমায়ুন আজাদ। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলামের বেলায় এতটা শব্দকৃপন হতে হলো কেন বুঝলাম না। নজরুল ইসলামের বেলায় এতটা বাক্য সংকীর্ণ না হলেও হত। নজরুল যে বাংলা সাহিত্যের একজন অবিসংবাদিত কবি সে ব্যাপারে একদমই চোখ খুলে তাকালেন না তিনি। কাজী নজরুল ইসলাম নিয়ে হুমায়ুন আজাদের বক্তব্য ছিল ঠিক এমন:
"কবি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলাম অত্যন্ত বিখ্যাত। "বিদ্রোহী কবি" উপাধিটি তার নামের সাথে জড়িয়ে গিয়েছে। তবে তিনি শুধু বিদ্রোহী ছিলেন না। বিদ্রোহের বিপরীত আবেগও রয়েছে তার কবিতায়। তার কবিতায় তারুণ্যের আবেগ প্রকাশ পেয়েছে খুব। আর প্রেমের কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে কৈশোরিক কাতরতা। তার খ্যাতির মূলে সামাজিক-রাজনৈতিক কারণ রয়েছে প্রবলভাবে।"
আজব! জবর আজব! মহাশয়, ধর্মাবতার, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি! নজরুল ইসলামের কাব্যিক প্রতিভাকে কি মাত্র এই কয়েকটি লাইন দিয়েই সীমাবদ্ধ করা যায়! একটা কবিজীবন কি শুধু তার কাব্য লেখায়! তার সাহিত্য রচনায় না? সমাজের সকল অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহসের মধ্যে কি কবিজীবনের স্বার্থকতা নিহিত নয়? তার করে যাওয়া অসংখ্য রাগ রাগিনীতে নয়? লেটোর দলে গান করেছেন , শ্যামা সংগীত, কীর্তন,লোকগীতি, গজল তৈরি করে গিয়েছেন সংখ্যার হিসেবের বাইরে- এসবের মধ্যে নয়! সেই গজল এর গীতিকাব্য গুলো কি কবিতা নয়? সর্বমোট সুর সংগীত ৩০০০ হাজারের মত। তন্মধ্যে ভক্তিগীতি ছিল ১২০০, যাতে ২৪৭টি শ্যামা সংগীত। এক কলম দিয়ে বের হয়েছে:
"ও মা, কালি সেজে ফিরলি ঘরে, কচি ছেলের কাজল মেখে,
একলা আমি কেঁদেছি মা সারাটা দিন ডেকে ডেকে।"
আবার এই একই কলম দিয়ে লিখা,
"আমি যদি আরব হতাম, মদিনারই পথ,
এই পথে মোর হেটে যেতেন নূর নবী হজরত।"
এমনি বহুমাত্রিক কাজী নজরুল ইসলাম। এতটাই বহুমুখী তার কাব্যরূপ।
"আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!"
আবার সেই কলম দিয়েই বের হয়েছে,
"তাওহীদের ঐ মুরশিদ আমার মুহাম্মদের নাম।
মুরশিদ মুহাম্মদের নাম।"
.
"আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে-
মোর মুখ হাসে, মোর চোখ হাসে,মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।"
আবার,
"বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাড়া।"
.
এইবার লক্ষ করি,
"হেরা গুহার হীরার তাবিজ ক্বোরআন বুকে দোলে,
হাদীস ফেকাহয় বাজুবন্দ দেখে পরাণ ভোলে।"
এই যে এই লাইনগুলোতে আরবি, ফারসি, বাংলার এক অভিনব মিশ্রণ ঘটাচ্ছেন নজরুল। আমি জানি, মহৎ কবি আব্দুল হাকিম(১৬২০-১৬৯০) এসবের ঘোর বিরোধিতা করেছেন। বলেছেন অন্য ভাষার শব্দগুলো বাংলা ভাষায় আনবেন না। তিনি লিখেও গেলেন,
"যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবানী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।
দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়।
নিজ দেশ তেয়াগী বিদেশ ন যায়।।
কবি বলেছেন, যারা বাংলা ভাষায় কবিতা লিখতে উৎসুক নয় তারা কোথাকার জন্ম তিনি তা জানেন না। এবং যাদের নিজ ভাষায় কবিতা লিখে মনে সুখ আসেনা তারা যেন এ দেশ ত্যাগ করে বিদেশ চলে যায়।
.
আব্দুল হাকিম এর এই লাইনগুলোর সাথে আমি চূড়ান্তভাবে একমত। এই লাইনগুলো হয়ত নজরুলকে অন্য ভাষার শব্দে কবিতা লিখতে কিছুটা নিরুৎসাহিত করতে পারে কিন্তু সাহিত্যে adaptation বা influenced শব্দ দুটিকে আমরা কিভাবে সংজ্ঞায়িত করি তা হল মূল ভাবার বিষয়। অনুবাদ ও অনুপ্রাণিত হওয়া যদি effective হয় তাহলে অবশ্যই তার চেয়ে মহৎ কিছু হতে পারে না। কীর্তিবাস ও কাশিরামের রামায়ণ-মহাভারত ঠিক যেমন। অনুবাদ হওয়া সত্বেও টিকে আছে অনেককাল, থাকবে অনন্তকাল। স্বভাবতই এইগুলো কালজয়ী কারণ এইগুলো effective। দেখতে গেলে বাংলা সাহিত্যের অনেক গুরুস্থানীয় লোকেরাও বিভিন্ন ভাষা-শিল্প-অঞ্চল-লোকালয় থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মহাপ্রলয় রচনা করেছেন। এই যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্তের শর্মিষ্ঠা, কৃষ্ণকুমারী নাটক, এমনকি সনেট ও তো শেক্সপিয়র আর পেত্রাক থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই সৃষ্টি করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "শেষের কবিতা"র এই লাইনগুলো দেখি,
"দোহাই তোদের একটু চুপ কর/ ভালোবাসিবারে দে মোরে অবসর।"
এই লাইনগুলো John Donne এর Cononization কবিতা থেকে নেওয়া। পংক্তিগুলো ছিল এমন,
"For Gods Sake hold your tongue and let me love."
নজরুলের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে বলে আমি মনে করি। নজরুলের শব্দমিশ্রন অন্য সাহিত্যিকদের সাহিত্য মিশ্রনের মতই বলে আমার ধারণা। কারণ নজরুলের এসব বৈচিত্রময় শব্দচয়ন বাংলা ঐতিহ্যের সাথে দ্রবীভূত হয়ে যায় নিমিশেই। একদম পানির মতোই।
দুঃখ এইখানেই যে, "লাল নীল দীপাবলি" স্বরূপে এতটাই দারুন ও মহৎ যে এই বইটি হাজার বছরের আয়ুকাল পাবে সন্দেহাতীতভাবে কিন্তু সেখানে নজরুল ইসলাম থাকবে অনেক তলানিতে। হুমায়ুন আজাদ "লাল নীল দীপাবলি" কে আগাগোড়া একটি Standard বই হিসেবে রূপ দিতে পেরেছেন বটেই কিন্তু এই একটি স্থানে তিনি হারিয়ে ফেলেছেন তার নিরপেক্ষতা, অপক্ষপাতিত্ব ও অবিমিশ্রিতার মাপকাঠিকে।
.
..................…...........................................
***(আমাদের এমন বুদ্ধিজীবী যারা মীর মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম, আহমদ ছফা কে পাশ কাটিয়ে পথ হাঁটবেন, তারা কোনদিনই বাংলা মুসলমান সাহিত্যিকদের মন বুঝতে পারবে না। জ্বি , এটা সত্যি। )

No comments

Theme images by merrymoonmary. Powered by Blogger.